ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশটির আরব রাজনৈতিক দলগুলো। বুথফেরত জরিপে ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ১৮ থেকে ১৯টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ও বিরোধী শিবির—কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায় আরবদের এই রাজনৈতিক উত্থান কি ফিলিস্তিনিদের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন আনবে? গাজায় যুদ্ধের পরিণতি, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতো জটিল বিষয়গুলোর সমাধান কি আরব দলগুলোর শক্তির মাধ্যমে সম্ভব?
আরবদের উত্থান
ইসরায়েলের আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাদের পূর্বপুরুষদের বড় অংশ ফিলিস্তিনি হলেও তারা ইসরায়েলের নাগরিক এবং জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন।
এবারের নির্বাচনে প্রধানত দুটি আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি আলোচনায় রয়েছে—মানসুর আব্বাসের রা'আম পার্টি এবং জয়েন্ট লিস্ট। জয়েন্ট লিস্টে হাদাশ, তাআল ও বালাদের মতো দল রয়েছে। দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য থাকলেও আরব নাগরিকদের সমঅধিকার, অপরাধ দমন, আবাসন, শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবা উন্নয়নের প্রশ্নে তাদের অবস্থানে মিল রয়েছে।
আলজাজিরার সাংবাদিক সাইমন স্পিকম্যান কর্ডাল বলেন, আরব দলগুলোর সম্ভাব্য সংসদীয় শক্তি সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে নেতানিয়াহুর শিবির এবং বিরোধী জোটের একাধিক নেতা আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
অর্থাৎ আরব দলগুলো সরকারে প্রবেশ করতে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেসের (আইডিএফ) সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট যোগ দিতে হবে।
এরআগে ২০২১ সালে মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা’আম পার্টি নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত জোট সরকারে যোগ দিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো কোনো স্বতন্ত্র আরব দল ইসরায়েলের সরকারে অংশ নেয়।
সে সময় রা’আমের লক্ষ্য ছিল আরব জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি, আবাসন সমস্যা সমাধান, অপরাধ দমন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তবে সেই সরকার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ও চ্যাথাম হাউসের সহযোগী বিশেষজ্ঞ ইয়োসি মেকেলবার্গ আলজাজিরাকে বলেছেন, মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বে রা’আম নিজেকে রাজনৈতিকভাবে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে।
তার মতে, ক্ষমতার সমীকরণে আরব দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর বক্তব্য ও বাস্তব হিসাবের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: গাজা ও পশ্চিম তীর
আরব দলগুলোর সংসদীয় শক্তি বাড়লেও ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য বদলের সবচেয়ে বড় বাধা ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডনীতি। গাজায় যুদ্ধের অবসান, পুনর্গঠন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ এবং স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা—এসব বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গভীর মতপার্থক্য থাকলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের অবস্থান কাছাকাছি।
আলজাজিরার বিশ্লেষক স্টিফেন কুইলেন এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালেও ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে ইসরায়েলের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
অন্যদিকে রয়্যাল হলোওয়ে, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের রাজনৈতিক অর্থনীতি গবেষক সামের জাবেরের মতে, নেতানিয়াহুর জোট পরাজিত হলেও ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে ইসরায়েলের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আশা করা উচিত নয়; প্রধান রাজনৈতিক জোটগুলোর অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতা পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, আরব দলগুলোর শক্তি বৃদ্ধি ফিলিস্তিনিদের জন্য রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি সুযোগ হলেও তা এককভাবে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করা কিংবা পশ্চিম তীরের দখলদারত্বের অবসান ঘটানোর নিশ্চয়তা দেয় না।
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কতটা বাস্তবসম্মত?
আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো সাধারণভাবে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি সমর্থন জানায়।
জয়েন্ট লিস্ট ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, দখলদারত্বের অবসান এবং নাগরিক সমতার ওপর জোর দেয়। রা’আমও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে, যদিও দলটির রাজনৈতিক কৌশল তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী ও দর-কষাকষিনির্ভর।
তবে তাদের দাবির বাস্তবায়ন নির্ভর করবে জোটের অন্য অংশীদারদের অবস্থানের ওপর। বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকোটসহ একাধিক প্রধান রাজনৈতিক নেতা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সমর্থন না দেওয়ায় আরব দলগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা কঠিন হতে পারে।
তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ও বিরোধী শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ইসরায়েলের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ফলে আরব দলগুলো যদি সরকার গঠনের আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তবে তারা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে রাজনৈতিক আলোচনায় আরও জোরালোভাবে তুলতে পারবে। কিন্তু সে দাবি বাস্তবায়নের জন্য শুধু সংসদীয় আসন নয়, বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপও প্রয়োজন হবে।
আশা আছে, কিন্তু নিশ্চয়তা নেই
ইসরায়েলের নির্বাচনে আরব দলগুলোর উত্থান ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। এই শক্তি ব্যবহার করে তারা বৈষম্য, অপরাধ, আবাসন সংকট ও নাগরিক অধিকার নিয়ে চাপ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দখলদারত্বের অবসানের প্রশ্নেও সংসদে তাদের কণ্ঠ আরও জোরালো হতে পারে।
কিন্তু ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব এবং গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ এক নয়। প্রধান ইহুদি-নেতৃত্বাধীন জোটগুলোর অবস্থান, সামরিক ও নিরাপত্তা নীতির ধারাবাহিকতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির বাস্তবতা বড় বাধা হয়ে থাকবে।
সূত্র: আলজাজিরা, টাইমস অব ইসরায়েল, আনাদোলু